প্রভু অভিজিত

 এই ঘটনা/গল্পটি এক ফেসবুক বন্ধুর লেখা। আশা করি শেষ অংশ খুব তাড়াতাড়িই পড়ার সুযোগ হবে আমাদের সবার।)

আমার লেখা "প্রভু অভিজিত" গল্পটিতে আশাতীত রিপ্লাই পেয়েছিলাম। মানে এই ধরনের গল্প, স্বল্প লাইক যুক্ত কোন পেজে দিয়ে যতটা লাইক কমেন্ট এক্সপেক্ট করা যায় সেই তুলনায় বেশি। পজিটিভ, নেগেটিভ, মিক্সড সব রকম কমেন্টই পেয়েছিলাম। গল্পটি সত্যি, আংশিক সত্যি না কাল্পনিক তা উল্লেখ করিনি গল্পে।

মাঝে পেশাগত কারনে একটু ব্যাস্ত হয়ে পরেছিলাম। ফেসবুক প্রোফাইল ডিএক্টিভেট রেখেছিলাম। কিন্তু খেয়াল ছিল না ফোনে পাসওয়ার্ড সেভ থাকায় ইতিমধ্যে মেল বা ফেসবুকের পাসওয়ার্ড ভুলে গেছি। ফোন ইতিমধ্যে চেঞ্জ করায় আর কোনভাবেই লগ ইন করতে পারলাম না আগের প্রোফাইলে। ফলে ফেসবুক প্রোফাইলের সাথে আমার পেজটিও নিশ্চিহ্ন হল সম্ভবত ( কারন আর কোন এডমিন ছিল না ওই পেজে)। ফলে বন্ধুর এই পেজেই আপাতত লিখতে বাধ্য হচ্ছি। "প্রভু অভিজিত" গল্পটি পড়ে পাওয়া কমেন্ট গুলোর জবাব যেমন দেব,  তেমনই এই আংশিক সত্যি গল্পের কতটুকু ঘটেছিল সেটাও বলতে চাই।

আর প্লিজ, কারো কাছে গল্পটি সেভ করা থাকলে প্লিজ পেজে জানাবেন। আমি গল্পটি সেভ করলেও এখন আর খুঁজে পাচ্ছি না। যাই হোক, এবার ঠিক কি ঘটেছিল আমার জীবনে সেটা খুব সংক্ষেপে বলি।

প্রভু অভিজিত....... ( real version).

(M/m)
.....
আমার জন্ম পশ্চিমবঙ্গের কোন এক প্রান্তিক জেলার ছোট শহরে। বাবা সরকারী চাকরি করত। কি পোস্ট সেটা বলছি না, কিন্তু এমন এক চাকরি যেখানে প্রচুর ঘুষ খাওয়া যায়। হ্যা, আমার বাবা ঘুষ খেতও। প্রচুর। এবং আমি ক্লাস ৬ এ ওঠার পরে বাবা কলকাতা শহরতলির অফিসে বদলি হয়ে আশার পরে এই ঘুষ খাওয়ার সুযোগ ও পরিমান প্রচুর বাড়ে। ইনকাম ট্যাক্সের হিসাবের ভয়েই সম্ভবত বাবা সেগুলো ব্যাংকে জমা করত না,,আমাদের বাড়ির প্রতিটি আলমারিতেই নোটের গোছা পরে থাকত তাই।
আমার পরিবারে আমি আর বাবা ছাড়া ছিল দিদি আর মা। বাবাকে আমি খুব ঘৃনা করতাম ছোটবেলায়। বাবা দেখতে ছিল আমার মতই কালো ও কুতসিত। ঘুষ খাওয়া ছাড়া তার আরেকটি নেশা ছিল মদ। এবং আমার ১০-১১ বছর বয়স অব্ধি বাবা প্রায়ই মদ খেয়ে তুচ্ছ কারনে আমাকে মারত। আমার প্রচন্ড রাগ হত,,কিন্তু কিই বা করার ছিল তখন? তবে বাবা কখনো দিদির গায়ে হাত তোলেনি, মায়ের গায়ে তোলার তাও প্রশ্নই নেই।
ক্লাস ৫ অবধি আমি বাড়িতে দিদি আর মায়ের সাথেই বেশি সময় কাটাতাম। যদিও কেউওই কখনো আমার ক্লোজ হয়নি। দিদি আর মাকে আমি ভয় পেতাম খুব। না মেরে কিভাবে কড়া শাসন করতে হয় সেটা মা খুব ভাল জানত, আর দিদিও মায়ের থেকেই শিখেছিল। বাবাকে আমি ঘৃনা করতাম, আর মা-দিদিকে খুব ভয় পেতাম।
আমাদের বাড়ির প্রতিটা সিদ্ধান্ত মাই নিত। বাবার ভুমিকা ছিল মাইনে আর ঘুষ থেকে টাকা কামানোয় সীমাবদ্ধ। সাথে রাতে মদ খাওয়া আর মাঝে মধ্যে আমাকে পেটানো। মেয়েদের অতিরিক্ত সম্মান করার শিক্ষা মায়ের থেকেই পেয়েছিলাম। খুব অদ্ভুত এক পরিবেশে বড় হয়েছিলাম আমি যেখানে টাকার কোন অভাব ছিল না আমাদের। কিন্তু সামান্য স্নেহ ভালবাসা থেকে বঞ্চিত ছিলাম আমি। জীবনে কেউ কখনো একবার যে শিশুর সাথে কেউ কোনদিন স্নেহ দেখিয়ে কাছে  টেনে কথা বলেনি সে কতটা  চাপের মধ্যে (স্ট্রেস) বড় হয় সেটা আমার চেয়ে ভাল কেউ জানে না হয়ত। আমার মধ্যে ভয় আর আতংক বোধ কাজ করত সবসময়। মাকে খুশি করতে আমি রেজাল্ট ভাল করতে খুব পরিশ্রম করতাম। রেজাল্ট ভাল করার পড়েও মা কোনদিন আমাকে কাছে টেনে আদর করেনি। সেটা কি আমি কাল আর কুশ্রী বলে? মা আর দিদির গায়ের রঙ ছিল মাঝারী,  দেখতে বেশ ভালই। মা দিদিকে কিন্তু যথেস্ট আদর দিত। এই অবহেলাই হয়ত আমার মধ্যে প্রথম কালো হিসাবে হিনম্মন্যতার বীজ পুঁতে দিয়েছিল।
 দিদি আমার চেয়ে ৮ বছরের বড় ছিল। আমরা কলকাতা শহরতলীতে বদলির আগে দিদি অন্য রাজ্যে কলেজে পড়তে চলে যায়। আমরা ঠিক কোন জায়গায় থাকতাম তখন সেটা আর উল্লেখ করছি না, এরপর কলকাতা শহরতলীর সেই জায়গাকে কলকাতা বলেই উল্লেখ করব।
আমরা যখন কলকাতায় এলাম তখন আমার ক্লাস ৬। বাবা এলাকার একটা ভাল সরকারী স্কুলে আমাকে ভর্তি করে দিল। কি করে জানি না, তবে এখন আন্দাজ করি তখন ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের পার্টি অফিসে গিয়ে নেতার কাছে টাকা দিয়েই ভাল স্কুলে ভর্তি করিয়েছিল। ( সেটা ১৯৯৯ সাল, সে আমলে ভাল সরকারী স্কুলে ক্লাস ৫ এর পরে বা পিছনের দরজা দিয়ে ভর্তি হতে চাইলে এটাই রাস্তা ছিল)। আমার বাবার আর যাই হোক, টাকার কোন অভাব ছিল না ঘুষের সৌজন্যে।
দিদি ততদিনে বাইরে চলে গেছে। নতুন কেনা বড় বাড়িতে মা বাবা আর আমি। বাবা সকালে উঠে অফিসে যেত, ফিরে এসে ঘুষের টাকার বান্ডিলে আলমারি ভরিয়ে সন্ধ্যা হলেই মদের বোতল নিয়ে বসে পরত। কখনো কখনো কলিগদের বাড়ি গিয়েও সুরাপান করে আসত বাবা। মা কিছু বলত না, কারন মায়ের তাতে কিছু যায় আসত না। মা কোনদিন বাবাকে বিশেষ পাত্তা দিত না, মনুষ্য পদবাচ্যই ধরত না হয়ত! সেটাও কি গায়ের রঙ এর জন্যই? শিশু হয়েও এই বিষয়টা আমার মনে গভীর দাগ কেটে গিয়েছিল।
কালো হওয়ার জন্য অপরাধবোধ বা ইনিফিরিওরিটি কমলেক্স সেই সময় আরও  দুটি সোর্স থেকে এসেছিল। প্রথমটি স্কুল। সেটিই এই বর্ননার মুল অংশ হতে যাচ্ছে, তাই পরে বলছি। অন্যটি বাড়ি। মা তখনো গৃহবধু। আমরা কলকাতা আসার কয়েক মাস পর থেকেই দেখতাম দুপুরে প্রায়ই একজন ফর্শা সুন্দর চেহারার লোক মায়ের কাছে আসত। বয়েসে মায়ের চেয়ে বছর ১০ এর ছোট হবে। একসাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে গল্প করত দুজনে,,মাঝে মাঝে মায়ের ঘরে গিয়ে ছিটকিনিও তুলে দিত। ওই বয়সে এর অর্থ না বুঝলেও শুধু ফর্শা হওয়ায় কালো বাবার থেকে কিছু ব্যক্তিগত অধিকার সে ছিনিয়ে নিচ্ছে এরকম একটা অনুভুতি আসত আমার। বাবা এই ঘটনা কখনো জেনেছিল কিনা জানিনা। কিন্তু খুব অদ্ভুত এক কষ্টকর কান্না পেত আমার । সেটা কোন অপরাধ ছাড়াই ভালবাসার পরিবর্তে শুধু ঘৃনা পাওয়ায়, কালো হয়ে জন্মানোর কষ্টে।
স্কুলের ঘটনায় আসি এবার। ঘটনা কি করে এতদূর এগোল বোঝাতে একটু বিস্তারিত বর্ননা দরকার। আমাদের স্কুল ছিল ক্লাস ৫-১২। স্বাধীনতার পরপর এক জমিদারের দান করা জমিতে তার অর্থ সাহায্যেই সরকার এই স্কুল তৈরি করে। এবং সেই থেকে প্রায়ই বিভিন্ন প্রয়োজনে তার পরিবার স্কুলকে অর্থ সাহায্য করত। সে আমলে স্কুলের স্যারদের মাইনে ছাড়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরকারী অর্থ সাহায্য খুব কম আসত। অথচ এই জমিদার পরিবারের সহায়তায় আমাদের স্কুল বিল্ডিং নতুন রঙে চকচক করত, কারেন্ট চলে গেলে চলত জেনারেটার। টিচার্স রুমে ফ্রিজ ছিল, আর প্রায়ই শনিবার করে ২-৩ পিরিয়ডের পরে স্কুল ছুটি দিয়ে স্যারেরা মহাভোজ করত। কার টাকায় এখন ভালই বুঝি। এককালের জমিদার ও একালের বহু কারখানার মালিকের কাছে এই টাকা যদিও হাতের ময়লা তবু স্কুল যে এই কারনে তার পরিবারকে মাথায় করে রাখবে বুঝতে অসুবিধা হয়না। তার উপর এরকম আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান পরিবার পাশে থাকলে যে অতি ফাঁকিবাজি করে আরামে চাকরি জীবন পার করর দেওয়া যাবে তা সব স্যারই বুঝত। সেই পরিবারের ছোট ছেলে শতানিক আমাদের সাথে এক ক্লাসে পড়ত। ফলে তার বা তার কাছের বন্ধুদের স্যারেরা কিভাবে ট্রিট করবে বোঝা কঠিন না। শুধু শতানিক নয়, সে ও তার দুই প্রিয় বন্ধুই ফলে স্যারেদের থেকে অতিরিক্ত সুবিধা পেত।
সেই সাথে ওরা তিন জন ছিল ক্লাস মনিটর। শতানিক, অভিজিত আর প্রান্তিক। ক্লাসের ১,২ আর ৩ নম্বর মনিটর যথাক্রমে। তিন জনের চেহারাতেও মিল ছিল। তিন বন্ধুই রোগা, ফর্শা বয়সের তুলনায় মোটামুটি লম্বা। এক কথায় খুবই সুন্দর চেহারা ছিল ওদের। আমাদের স্কুলে মনিটরদের অস্বাভাবিক ক্ষমতা দিয়ে রেখেছিল  স্যারেরা।  অন্য ক্লাসে কি হত জানি না, কিন্তু আমাদের ক্লাসে কোন ছেলেকে বেঞ্চ থেকে উঠতে হলেও মনিটরের পার্মিশান নিতে হত, ক্লাসের বাইরে যেতে হলে তো বটেই। স্যারেরা সবাই ফাঁকিবাজ হওয়ায় অর্ধেক পিরিয়ডে ক্লাসে স্যার থাকত না। কেউ কথা বলেছে এই অভিযোগে মনিটরেরা তাকে কান ধরে নিল ডাউন করা থেকে থাপ্পর বা স্কেলের বারি মারতে পারত। নিয়ম ছিল, মনিটরেরা যাই শাস্তি দিক, তখন মুখ বুঝে মানতে হবে। পরে স্যার এলে সে অভিযোগ করতে পারে। এরকম অভিযোগ এলে স্যারেরা প্রথমে ক্লাসে উপস্থিত সবাইকে বলবে তার সাথে অন্যায্য কিছু করা হয়েছে মনে করলে হাত তুলতে । অন্তত ১০% ছেলে হাত তুললে তবে স্যার অভিযোগ শুনবে। দরকার মনে হলে বিচার করবে। আর যদি তা না হয়, পরের তিন দিন মনিটরেরা তাকে যা খুশি শাস্তি দিতে পারে সে অভিযোগ করতে পারবে না।
গনতান্ত্রিক ভাবে ভাবলে ব্যাপারটায় অস্বাভাবিক কিছু নেই। কাউকে অকারনে কঠিন শাস্তি দিলে ক্লাসের ৬০- ৭০ জনের মধ্যে অন্তত ৬-৭ জন কি হাত তুলে স্যারকে জানাবে না যে খারাপ কিছু হয়েছে তার সাথে?
আসলে জানাত না। কারন হিসাব টা পাটিগনিতের মত সহজ ছিল না। ক্ষমতার রাজনীতি শিশুদের স্কুলেও আসলে পাটিগনিত মেনে চলে না যে!
মনিটরদের এই অতিরিক্ত ক্ষমতা তারা মোটেই ক্লাসের সবার উপরে দেখাত না। আমি স্কুলে গিয়ে দেখেছিলাম আমি ছাড়া আর মাত্র ৫ জনের উপরেই তারা এই ক্ষমতা প্রয়োগ করত। কোনদিন এমারজেন্সি হলেও টয়লেটে পর্যন্ত যাওয়ার পর্যন্ত অনুমতি পেতাম না আমি সহ এই ৬ জন। আর বাকিদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা ছিল। "আমি টয়লেটে গেলাম" বলে চলে গেলেই হল, এরকম। আমাদের ৬ জনের প্রতি সহানুভুতির দৃষ্টি এদের কারোর ছিল না কোনদিন। কারন হয়ত ওদের চেহারা আর আর্থিক অবস্থা ভাল। আর আমি ছাড়া অত্যাচারিত বাকি ৫ জনের সবাই অতি গরীব, কালো খারাপ চেহারার। গোপাল যেমন শতানিকদের বাড়ির বংশ পরম্পরায় চাকরের সন্তান। শতানিকের ব্যাগ ক্যারি করা, স্কুলে টুকিটাক ফাই ফরমাশ খাটার জন্যই হয়ত ওকে এই স্কুলে ভর্তি করিয়েছে শতানিকের বাবা। আর ওর মানসিকতাও ছিল চাকরের মতই। এরকম ট্রিটমেন্ট ও কোনদিন খারাপ চোখে দেখে নি। হয়ত জন্ম থেকে এরকম ব্যবহার পেয়ে পেয়ে এটাই ওর কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল।
আমি যেদিন স্কুলে প্রথম গেলাম সেদিন ক্লাসের মধ্যেকার এই " class division " সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। আমি গিয়ে থার্ড বেঞ্চে বসেছিলাম। একটা ছেলে এসে এক ধাক্কায় আমার ব্যাগ নিচে মেঝেতে ফেলে দিল। আমি কি করব বুঝতে না পেরে ব্যাগ তুলে থতমত মুখে ওর দিকে তাকালাম। ক্লাসের সবাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। নতুন এলাকায় সম্পুর্ন অপরিচিত স্কুলে প্রথম দিনই এই অভিজ্ঞতা আমাকে আতংকিত করে তুলেছিল। কি করব বুঝতে না পেরে। পরের বেঞ্চে ব্যাগ রাখতে গেলাম।  আবার একটা ছেলে আমার ব্যাগ ফেলে দিল মুখে কিছু না বলে। আমি নিচু হয়ে তুলতে গিয়ে দেখি উলটো দিকের বেঞ্চের সাইডে বসা একটা ফর্শা সুন্দর চেহারার ছেলে তার সাদা স্নিকার পরা  পা দুটো  আমার ব্যাগের উপরে তুলে দিয়েছে। সেদিনই পরে জেনেছিলাম ওর নাম অভিজিত,,ক্লাসের ২য় মনিটর। আমার ব্যাগের উপরে জুতোর তলা মুছে ব্যাগটা আমার দিকে ঠেলে ও বলল "কেলোদের জায়গা লেফট লাস্ট বেঞ্চে।" আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না ও কি বলল। আমি আবার থতমত খেয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম। কিরকম এক অদ্ভুত স্ট্রেস ফিল করছি আমি তখন, গা গোলাচ্ছে যেন সেই অসহ্য চাপে!
এবার অভিজিত জুতো পরা ডান পা তুলে আমার বাঁ কাঁধে আলতো একটা ঠ্যালা দিয়ে বলল " তুই মাথামোটা নাকি? সহজ কথা বুঝিস না? কেলোমুখো রিক্সাওয়ালার ছেলেদের জায়গা বাঁদিকের লাস্ট বেঞ্চে। ওখানে গিয়ে বস যা।"
আমি কিছু না বলে চুপচাপ মাথা নিচু করে উঠে লেফট লাস্ট বেঞ্চে বসে পরলাম।
প্রথম এক সপ্তাহের মধ্যেই আমার জায়গা লাস্ট বেঞ্চের "কেলো রিক্সাওয়ালার ছেলে"দের দলে কনফার্ম হয়ে গেল। অভিজিতের স্রেফ এবিউজ করা কথা থেকেই হয়ত ক্লাসের প্রায় সবাই এমনকি অনেক স্যারও জেনে গেল আমার বাবা " রিক্সাচালক"।
ক্লাসে প্রথম এক মাসে প্রায় সবাই আমার পিছনে লাগত লাস্ট বেঞ্চের " কেলো গ্রুপ" বাদে। আমার গায়ের রঙ নিয়ে, " রিক্সাচালক ক্লাস" নিয়ে, এমনকি আমার জন্মের জেলা নিয়েও। আমার বাংলায় একটু জেলার টান  ছিল বলে। আমার নাম হয়ে গেল কালু, গায়ের রঙ কালো বলে। নামটা অভিজিতেরই দেওয়া। আমার আসল নাম কেউ জানতই না প্রায়।
বেশিরভাগ ছেলে পিছনে লাগলেও কোন ছেলের গায়ে হাত তোলার অধিকার মনিটর ছাড়া কারও ছিল না। আর মনিটরদের এই অধিকারটা একটু বেশিই ছিল অন্য অনেক অধিকারের মতই। যেমন স্যারেরা ক্লাসে থাকার সময়ও কোন ছেলে টয়লেটে যেতে চাইলে মিনিটরের পারমিশান নিয়েই চলে যেতে পারত, স্যারকে বলতে হত না। কারন স্যারেরা পড়াতে বিজি থাকতেন, তাই এই নিয়ম! তেমনই পড়া না পারলে বা শৃঙখলার কারনে কোন ছেলেকে মারতে হলে স্যারেরা উঠে কষ্ট করতেন না। মনিটরেরাই উঠে নিজেদের ইচ্ছা মত মারত। স্কেলের বারি গালে পরবে না হাতে, নাকি গালে চড় নাকি কান ধরে নিল ডাউন.. শাস্তি কি হবে সেটাও ঠিক করত মনিটরেরাই। লাস্ট বেঞ্চের কেলো গ্রুপের ছেলে ছাড়া  অন্য যে কোন ছেলে শাস্তি পেলে বড় জোর হাতে একটা আলতো স্কেলের বারি বা কান ধরে ৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকাই ছিল হায়েস্ট। আর আমাদের লাস্ট বেঞ্চের গ্রুপের জন্য শাস্তি ছিল ভয়ানক বেশি। শাস্তি কি দেওয়া হবে সেটাও যে মনিটর দিতে আসত সেই ঠিক করত। পড়া না পারার অপরাধে হয়ত প্রথমে দুই হাতে ১০ টা করে স্কেলের বারি পরল। তারপরে দুই পিরিয়ড নিল ডাউনের সাজা। নিল ডাউন হলে দুই গালে ৫ টা করে সজোরে থাপ্পর। যেখানে একই অপরাধে অন্য ছেলেরা ৫ মিনিট কান ধরে দাড়িয়েই নিস্তার পেত।
আমাদের এই কঠোর শাস্তি অভিজিতই দিত অর্ধেক সময়ে। শতানিক বা প্রান্তিকের চেয়ে ও মারত বেশি জোরে আর বেশি বার। আমাদের টর্চার করে প্রান্তিক আর শতানিকও মজা পেত ঠিক, কিন্তু অভিজিতের ক্ষেত্রে এটা অনেক বাড়াবাড়ি রকমের বেশি ছিল। হয়ত ছোট থেকেই ও স্যাডিস্ট - নার্সিসিস্ট পার্সোনালিটির বলে!
এক মাসের মধ্যেই আমি বুঝতে পারলাম কোন এক অজ্ঞাত কারনে মনিটরেরা আমাকে মারলে আমার ভাল লাগে। অভিজিত বেশি জোরে মারত, বেশি অপমান করত বলে ওর মার আরও বেশি ভাল লাগত। ক্লাস শুদ্ধু ছেলের ক্ষেপানোয় আগে যে ভিশন স্ট্রেস হত, কালো বলে আমি দুনিয়ার কাছে অবজ্ঞার পাত্র ভেবে যে ভয়ানক অবসাদ হত সেটা যেন এই মার খাওয়ার ফলে কোন অজ্ঞাত প্রক্রিয়ায় কেটে যেত। অভিজিত আমাকে যত তুচ্ছ কারনে যত বেশি মারত তত ও ফর্শা, আমার প্রভু, আমার মত কালো ছেলেকে ও যত খুশি মারতে পারে এই ভেবে কিরকম এক আনন্দ হত আমার। যদিও এ কি অদ্ভুত অনুভুতি হচ্ছে আমার,, নিজের অপমান নিজে কেন এঞ্জয় করছি এই ভেবে বিভ্রান্তও হতাম।  তবু বহুবার এমন হয়েছে পড়া জেনেও বলিনি পড়া না বললে  অভিজিত গোটা ক্লাস আর স্যারের সামনে আমাকে মারবে বলে!
আমি স্কুলে ভর্তির দু মাস পরের একদিনের ঘটনা। টিফিন পিরিয়ডের আগের পিরিয়ড। ভিশন বৃষ্টি হচ্ছিল প্রায় দুই ঘন্টা ধরে।  ক্লাসে যথারীতি স্যার নেই। ক্লাসের অর্ধেক ছেলে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে হই হুল্লোর করছিল। কিন্তু আমাদের লাস্ট বেঞ্চের ছয় জনের শুধু উঠে দাঁড়ানোরও অনুমতি নেই!
বিমল ( ও আবার ক্লাস সিক্সে ফেল করা, আসলে অভিজিতদের এক বছরের সিনিয়ার ছিল)  নামে আমাদের লাস্ট বেঞ্চের একজন সেকেন্ড পিরিয়ড থেকে টয়লেট যাওয়ার জন্য রিকোয়েস্ট করছিল। কিন্তু কোন মনিটর যেতে দিচ্ছিল না। এইভাবে আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ওর মজা পেত। ফোর্থ পিরিয়ডে এসে ও আর সহ্য করতে না পেরে বেঞ্চ থেকে উঠে মেঝেতে দাঁড়িয়ে থাকা শতানিকের পা জড়িয়ে ধরল " প্লিজ আর পারছি না সহ্য করতে। এবার একটু যেতে দাও টয়লেটে, প্লিজ।" ও স্রেফ শতানিকের জুতো পরা পা দুটোর উপরে মাথা রেখে আস্তে আস্তে জুতোর উপরে মাথা ঘসছিল ওর দয়ার আশায়।  কিন্তু মনিটরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে টয়লেটে চলে গেলে কি শাস্তি হবে সেটা জানায় সেটা করার সাহস হচ্ছিল  না ওর।
 শতানিক ওকে প্রায় ১ মিনিট নিজের জুতোয় মাথা ঘসতে দিল। তারপর পা দিয়ে ওর মাথাটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল টিফিন হলে যাবি। এখন বিনা অনুমতিতে বেঞ্চ থেকে ওঠার শাস্তি হল কান ধরে নিল ডাউন। ও বিনা বাক্যব্যায়ে শাস্তি মেনে কান ধরে নিল ডাউন হল। কিন্তু ওর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল ও আর সহ্য করতে পারছে না টয়লেট। তখন অভিজিত এসে নিল ডাউন হয়ে থাকা  বিমলের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে বলল " বিনা অনুমতিতে বেঞ্চ থেকে ওঠার সাহস হয় কি করে তোর ফেল্টু?" এই বলে জুতো পরা ডান পা তুলে সোজা মুখে  লাথি মারল অভিজিত। পরপর ৩ বার। লাথি খেয়ে বিমল উলটে অভিজিতের জুতো পরা পায়ে মাথা ঠেকিয়ে ক্ষমা চাইল। আর এই ঘটনা দেখে গোটা ক্লাস হাসিতে ফেটে পরল।
তখনই খেয়াল করলাম ওর প্যান্টের সামনের অংশটা যেন একটু ভিজে উঠল। আর সাথে সাথে বিমল উঠে ছুটল বারান্দার দিকে। কারো অনুমতি নেওয়ার অবস্থায় ও আর নেই। বারান্দা থেকে সামনের মাঠে পেচ্ছাপ করতে লাগল চেন খুলে।
এই অবাধ্যতা অভিজিত একদমই সহ্য করল না। ওর ব্যাগ তুলে সোজা ছুড়ে ফেলল বাইরের মাঠে। বৃষ্টির তোড়ে সেই মাঠ তখন ছোট খাট পুকুর। বিমলের ব্যাগ তাতে প্রায় ডুবে গেল।
ক্লাসের প্রায় সবাই যেখানে মনিটরদের পক্ষে,, এমনকি স্যারেরাও এর প্রচ্ছন্ন মদতদাতা, তখন এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জোর খুব কম জনের থাকে। আমার মত তেমন জোর বিমলেরও ছিল না। ও বৃষ্টির মধ্যে নেমে মাঠ থেকে বৃষ্টি ও জলে ভেজা ব্যাগ উদ্ধার করে আনল।
ও ঘরে ঢোকার সাথে সাথে নিজে থেকেই কান ধরে নিল ডাউন হয়ে ক্ষমা চাইল। কিন্তু অভিজিত আবার ওর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওর মুখে লাথি মেরে বলল " আমাদের অনুমতি ছাড়া টয়লেটে যাওয়ার সাহস হয় কি করে তোর ফেল্টু?" এবার আর ২-৩ টে না, একের পর এক লাথি মেরেই যেতে লাগল ওর বুকে আর মুখে। সাথে প্রান্তিক আর শতানিকও যোগ দিল কিছুক্ষনের জন্য। বিমল একবারের জন্যেও বাধা দেওয়ার সাহস পেল না। গোট ক্লাসের কাছে এটা ছিল অত্যন্ত মজার ব্যাপার!
অভিজিত অন্তত ৫০ টা লাথি মারল বিমলকে, তার অর্ধেক অন্তত মুখে! টিফিন পিরিয়ড শুরু হলে বেঞ্চে ফিরে ওর জলে ভিজে চুপসে যাওয়া ব্যাগে মাথা রেগে ও ভিশন কাঁদতে লাগল। মোহন ওকে বোঝাতে গেল এবার আমাদের এক হয়ে এর প্রতিবাদ করতে হবে। এইভাবে মুখে লাথি মারা, টয়লেট করতে যেতে না দেওয়া সহ্য করা যায় না। আর শতানিকদের চাকর গোপাল ওকে বোঝাতে লাগল অভিজিতেরা মনিটর,  আমাদের প্রভু স্থানীয়। ওরা যদি ঠিক মনে করে আমাদের এভাবে শাস্তি দিতেই পারে। এতে কিছু মনে করা উচিত না!
আমি কিছু না বলে ওদের দুজনের কথা শুনতে লাগলাম। আমার কেন জানি গোপালের অদ্ভুত কথাই ভিশন ভাল লাগতে লাগল। আমাকে যদি এইভাবে কখনো অভিজিত লাথি মারে তাহলে আমি কি কষ্ট পাব? না, খুশিই হব!!
টিফিন পিরিয়ড শেষ হতে ক্লাস শুরু হল।  স্যার আসতে অভিজিত কম্পলেন করল বিমলের নামে।  আর তখন খেয়াল করল সবাই,  বিমল আর ক্লাসে নেই। না ও, না ওর ব্যাগ। ও ফিরলে ওকে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দেওয়া হবে বলে স্যার ঘোষনা করল। কিন্তু বিমল আর ফিরল না স্কুলে। ১ ঘন্টা, ১ দিন,,১ মাস....১ বছর পেরিয়ে গেল,  তবু কোনদিন আর এ স্কুলে ওকে দেখা গেল না। কেউ ওর খোঁজ পেল না, নিলও না। পরীক্ষায় ফেল করা ভ্যান ওয়ালার কুতসিত ছেলে যদি স্কুল ছেড়ে দেয় তাহলে বরং স্কুলের সুনাম বাড়বে।  এইসব ছেলে স্কুলে থাকা মানে স্কুলের লজ্জা এমনই যেন সবার হাবভাব!
সবাই প্রায় অভিজিতের পক্ষে ছিল তা জেনেও এত মারাত্মক ঘটনা মোহন মানতে পারল না। ও উঠে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করল স্যারকে। কেন গরীব আর কালো বলে আমাদের টয়লেটে যেতে দেবে না, কেন এইভাবে মুখে জুতো পরা পায়ে মুখে লাথি মারার পরেও মনিটরদের শাস্তি হবে না এই নিয়ে প্রশ্ন তুলল। আর স্যার স্কুলের সেই গনতান্ত্রিক নিয়ম কাজে লাগাল এই অভিযোগের সারবত্তা বুঝতে। বৃষ্টির দিন বলে সেদিন স্কুলে ৪০ জন মত এসেছিল। লাস্ট বেঞ্চারদের মধ্যে আমি, বিমল, গোপাল আর মোহন। বিমল তো আর নেই। গোপাল অত্যাচারিত হয়েও চিরকালের মত ওর "প্রভু" দের সাপোর্ট করবে জানা কথা। আমিও মোহনকে সাপোর্ট করতে হাত তুললাম না। সেটা কিছুটা ভয়ে, একা মনিটরদের বিরুদ্ধে গেলে কি শাস্তি হবে সে আন্দাজ করা যায় বৈকি। তবে তার চেয়েও বেশি ছিল ভাল লাগা। হ্যা, বিমলের মত একইভাবে অভিজিতেরা আমাকে ট্রিট করলে আমি মোটেই বাধা দেব না। ওরা ফর্শা, ওরা আমার মত কালোদের প্রভু! ভাবতেই কেন জানি না সারাজীবনের যত স্ট্রেস সব নিমেষে উধাও হয়ে যায়! প্রভুর জুতোর তলায় আত্মসমর্পনের মত শান্তি আর কিছুতেই নেই!
মোহনের পক্ষে একটাও ভোট পরল না। ফলে প্রমানিত হয়ে গেল যে অভিজিত মোটেই বিমলের উপরে অকারন অত্যাচার কিছু করেনি, পুরোটাই মোহনের মিথ্যা অভিযোগ। ফলে যা আইন স্কুলে, তাই রায় দিল স্যার। পরের ৩ দিন মনিটরেরা ওকে যা খুশি শাস্তি দিক,  ও তাই নিয়ে কোন অভিযোগ করতে পারবে না। মনিটরদের নামে মিথ্যা অভিযোগের এটাই শাস্তি।
অভিজিত বলল  বিমলকে যেভাবে ও ট্রিট করেছে বলে অভিযোগ করছিল মোহন,,ও এখন সেটাই করবে মোহনের সাথে। মোহনকে ও নিল ডাউন করাল প্রথমে। তারপরে স্নিকার পরা পায়ে ওর মুখে বুকে লাথি মারতে লাগল একই কায়দায়, যেভাবে বিমলকে মেরেছিল। সাথে যোগ দিল শতানিক আর প্রান্তিক। পার্থক্য হল এবার সবই হচ্ছিল স্যারের চোখের সামনে! এরপরে ওকে মেঝেতে শুইয়ে ওর বুকে মুখে জুতোর তলার ময়লা ঘসে মুছল তিন মনিটরই। স্যার চলে যাওয়ার পরেও তিনজন মিলে মোহনের উপরে টর্চার চালিয়ে গেল।  অভিজিত প্যান্ট থেকে বেল্ট খুলে মার‍তে লাগল মোহনকে। সাথে স্নিকার পরা পায়ে মুখে লাথি তো ছিলই।
স্কুল ছুটির ঘন্টা পরার ১০ মিনিট পরে ক্লাস রুম থেকে বারান্দায় বের করে এনে ওর গায়ে মাথায় পেচ্ছাপ করে দিল অভিজিত। ক্লাসের অনেকে তখন বাড়ি চলে গিয়েছে, আবার অনেকে ঘিরে ধরে মজা দেখছে।
একইদিনে দুজন ক্লাসমেটের উপরে চরম অত্যাচার চালাল অভিজিত, স্যারেদের পরোক্ষ মদতে।  বিমল আর ফিরল না স্কুলে , মোহন ও না। কিন্তু মোহনের মা এল পরদিন।  কিভাবে স্কুলে একজন ছাত্রের উপর স্যারের উপস্থিতিতে এমন টর্চার হয় সেই প্রশ্ন তুলে হুংকার ছাড়ল হেডস্যারের ঘরে গিয়ে। তাকে কোনভাবে শান্ত করতে না পেরে স্যার আমাদের ক্লাস রুমে নিয়ে এসে গনতান্ত্রিক পদ্ধতিকে হাতিয়ার করলেন। কাল মোহনের সাথে অভিজিত খারাপ আচরন করেছে এটা কে কে মনে করে হাত তোল বলার পরেও কেউ হাত তুলল না। কিন্তু অভিজিত যেই বলল এবার প্রশ্ন করুক কে কে মোহনকে ক্লাস ঘরের ভিতরে টয়লেট করে ঘর নোংরা দুর্গন্ধ করে তুলতে দেখেছে তখন একটা হাত ও নিচে নেমে রইল না আর। তখন প্রান্তিক বলল মোহন প্রায়ই ক্লাস রুমের ভিতরে পেচ্ছাপ করে দিত ঘরে দুর্গন্ধ হলে ক্লাস করানো সম্ভব নয় বলে ছুটি দিয়ে দেওয়া হবে ভেবে। ওকে সবাই অনেক বলেও বন্ধ করানো যায় নি। তাই বাধ্য হয়ে কাল ওকে চড় লাথি মেরেছি। এছাড়া কোন উপায় ছিল না। এবারও এই মতের সমর্থনে ১০০% হাত উঠল, আমাদের লাস্ট বেঞ্চ সমেত! হেড স্যার এবার গম্ভীর গলায় বলল,  " অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের ছেলেকে মানুষ করেন। ওকে আর এই স্কুলে আসতে হবে না। টিসি দিয়ে দিচ্ছি।"
মোহন আমার বন্ধু হয়ে উঠেছিল  এই কয়দিনে। ও যে খুব ভাল ছেলে তা নিয়েও আমার কোন সন্দেহ ছিল না।  কিন্তু তা সত্ত্বেও ওর বিনা দোষে স্কুল থেকে বিতাড়িত হওয়ার শাস্তি আমার খারাপ লাগল না। আমাদের উপর মনিটরদের অত্যধিক অত্যাচার আমাকে নেশায় আচ্ছন্ন করে তুলেছিল যে ততদিনে!
দুঃখের বিষয় ছোট, মাঝারী অনেক ঘটনা ঘটলেও ক্লাস ৬ এ আর এরকম বড় কোন ঘটনা ঘটেনি। নিল ডাউন হয়ে থাকার সময়ে পাঁজরে ২-৪ টে লাথির বাইরে প্রভুদের কারও লাথিও সেভাবে পরেনি ওই বছরে আমার উপরে। তবে সব বদলে গেল ক্লাস ৭ এ ওঠার দুই সপ্তাহের মধ্যেই। সৌভাগ্য হল স্যার সহ গোটা ক্লাসের সামনে অভিজিতের জুতোর তলায় চুম্বন করে ক্ষমা চাওয়ার, মুখে ওর লাথি খাওয়ার। তাও দুই একদিনের জন্য না, টানা ২ বছরের বেশি সময়ের জন্য। সেই ঘটনা একটু পরে লিখছি। সেই সাথে উচিত/ অনুচিত, এগুলো গে/বিডিএসএম কিনা এই নিয়ে আগের আরো বেশি কাল্পনিক গল্পের প্রশ্ন গুলোর উত্তর শেষে দেব। আর হ্যা, এখানে যা লিখছি তার ৯০% এর বেশি সম্পুর্ন সত্যি। শুধু নিজের জীবনের সাবমিসিভ অত্যাচারিত হওয়ার ঘটনায় একটু পরিচয় আড়াল রাখতে যতটুকু জল মেশাতে হয় ততটুকুই শুধু মিশিয়েছি। সাথে খুবই সামান্য মশলা। আর হ্যা,,গল্পে বাকি চরিত্রের নাম পরিবর্তন করলেও অভিজিতের নাম পরিবর্তন করি নি। প্রভু অভিজিতকে অন্য কোন নামে ডাকা কাল্পনিক গল্পেও সম্ভব না আমার পক্ষে।
তবে একটা প্রশ্নের উত্তর এখানেই দিয়ে রাখি। আমি কি গে? না. ০০০০১% ও না। আমার up bringing normal হলে আমি ১০০% স্ট্রেট হয়েই জীবন কাটাতাম। অভিজিতদের ৩ জনের প্রতি আমার এক্সট্রিম সাবমিসিভনেস একদমই ঘটনা প্রবাহের আকস্মিকতায় হয়ে যাওয়া। ওদের অত্যাচারী সেল্ফিশ ক্যারেক্টারের সামনে মাথা নত না করলে যে চুড়ান্ত চাপ আমাকে সহ্য করতে হত তা আমার শিশু মস্তিস্কের পক্ষে নেওয়া সম্ভব ছিল না।  আর পরিবার সহ কোথাও আমার পাশে দাঁড়ানোর কেউ থাকলেও আমার মস্তিস্ক আমাকে এই দিকে নিয়ে যেত না। অভিজিতদের দেব তুল্য জায়গায় বসিয়ে,  ওদের প্রতি চুড়ান্ত ভাবে সাবমিট করে আমার মস্তিস্ক শুধু চেয়েছিল ওই চুড়ান্ত চাপ থেকে বের হতে। কিন্তু  আমার হৃদয়ে ওদের সেই দেবতুল্য স্থান এখনো আছে, ওদের সাথে দেখা বন্ধ হওয়ার দেড়  দশক পরেও।
( আগের ভার্শান টা হারিয়ে না গেলে এতে শুধু রিয়াল পয়েন্ট গুলো তুলে ধরতাম। true/fantasy action গুলো বাদ দিয়ে। কিন্তু সেটা হারিয়ে ফেলায় এটাকে স্বয়ং সম্পুর্ন ভার্শান হিসাবে লিখছি আবার। একটু বেশি বড় হওয়ায় লিখতে একটু টাইম লাগবে।)

Comments

Popular posts from this blog

কালু, তার মা-বোন আর ৩ প্রভু

লুজারের জীবন দর্শন ৫.....

mini stories 3 & 4